জীবনের-গল্প

মৃত্যুর খুব কাছ থেকে শোনা জীবনের গল্প

নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে হুট করেই একটা গ্রুপের একটা পোস্টে চোখ থমকে গেল। একজনের চিরবিদায় নিয়ে লেখা পোস্টটি। যেখানে সেই ‘ওপারে চলে যাওয়া’ যাত্রীটির কয়েকটা পোস্ট ও ছবি তুলে ধরা।

কৌতূহলবশতঃ পোস্টটিতে কন্টিনিউ করা। সেখানে পরপারের যাত্রীটিকে মেনশন করে মনের দুঃখের কথা গুলো লেখা ছিল। যার জন্যে লেখা সে আদৌ দেখবে কি-না জানি না, তবে তাকে দেখবার, জানবার ভীষণ আগ্রহ হলো।

কৌতূহল দমনে আইডিটিতে ক্লিক করতেই, দেখা গেল- ছেলেটির চুলহীন ছবির প্রোফাইল, কভারে জাতীয় শহীদ মিনার। নিজ সম্বন্ধে লেখা- স্বাবলম্বী। দেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এন্ড টেকনোলোজি (বি ইউ বি টি)’ -এর ছাত্র সে। ছেলেটির সর্বশেষ পোস্টটি ছিল এ বছরেরই ৪ ফ্রেব্রুয়ারি।

সেই ‘হতে যাওয়া কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার’-এর কয়েকটা পোস্ট দেখে চোখের জল সংবরণ করা বেশ দুরুহই হয়ে ওঠেছিল। মৃত্যুর আগ মুহুর্তগুলো যে এতটাও হৃদয়বিদারক আর মর্মস্পর্শী হতে পারে- না দেখলে, না পড়লে সেসব বোধ করি অজানাতেই থেকে যেত। কষ্টের পারদ তো তখনই আকাশচুম্বী হয়ে যায়- যখন জানা যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে ছেলেটি সুস্থ হয়েও ওঠেছিল। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যে তখন সৃষ্টিতে নন বরং বিনাশে মনোযোগী ছিলেন। তাইতো ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আবারও ব্রেইনে ক্ষত দেখা যায় ছেলেটির। আর মুদ্রার ওপিঠে ফলাফল- এতগুলো মানুষের আশার বিপরীতে বাঁধভাঙ্গা চোখের জল।

আবেগী কিন্তু যথেষ্টই বাস্তবসম্মত আর জীবনমুখী চিন্তাচেতনার স্ফূরণ ঘটেছিল ছেলেটির ফেসবুকের লেখনীতে।

যার কয়েকটা ছিল এরকম:

“হসপিটাল জেলখানার চাইতেও কঠিন।”

-এক বাক্যে যেন পুরো পরিস্থিতির অবয়ব!

এছাড়াও নিঃসঙ্গতা নিয়েও বেশি কিছু লেখা। হসপিটালের বেডেও চুলহীন মাথার “এই বেশ ভালো আছি” টাইপের সেলফি।

ছেলেটির কমেন্টগুলোও খুব দেখতে মন চাইলো। একজন মানুষের চিন্তাধারা যে তার পোস্ট থেকেও কমেন্টেই বেশি প্রতিফলিত হয়।

প্রথমে পান্থপথ সমরিতা হাসপাতাল, পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে- চিকিৎসা চললো চেন্নাইয়ের খ্রিস্টিয়ান মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটালে। লিউকোমিয়া ব্লাড ক্যান্সারের ভাইরাসকে থেরাপি দিয়ে, শুরু হলো বনমেরু ট্রান্সপ্যলেন্টশন। এরপর আবারো বিধি বাম! সাইনোসাইটিস ইনফেকশন, মাথা ব্যথা। অনেক পেইন কিলারেও হলো না কিছুই।

এরপর নাকের ভিতরে টেস্ট। নাকের ভিতর থেকে মস্তিষ্ক বরাবর এই ইনফেকশন পৌছে যাচ্ছিল। নাকের ভিতরে ১ম অপারেশনেও কিছু হলো না, হলো না ২য় অপারেশনেও।  ৩য় অপারেশনে ডাক্তার বললো, এই অপারেশনে রোগী চোখে এবং মস্তিষ্কে সমস্যা হতে পারে। তবুও সবাই অনুমতি মিললো- এই ভেবে যে অন্তত প্রাণে বাঁচুক ছেলেটি।
অপারেশন হলো। নিভে গেল ছেলেটির নয়নের আলো। প্রাণের স্ফূরণে শক্তি সঞ্চারের চেষ্টাটা অব্যাহত থাকলেও চিনতেও পারছিলো কাউকেই।

এরপর পৌঁছল অবনতির চূড়ান্ত চূড়ায়। ধীরে ধীরে ডান পাশ এবং পরে বাম পাশ নিস্তেজ হতে থাকলো। জ্ঞান হারাতে লাগলো, তখনই ডাক্তার বুঝতে পেরে গেল যা বোঝার। কানাকানি করে বলতে থাকলে পরিবার বুঝে গেল সব।

বিদায়ের পর টাকার রশিদ নিতে গেলে ডাক্তার অপেক্ষা করতে বললেন। এদিকে অপেক্ষা ওদিকে মিটিং। ডাক্তারের জিজ্ঞাসা- কত টাকা আছে তাঁদের। জানা গেল- নেই খুব বেশি। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হসপিটাল কর্তৃপক্ষ বেশ খানিকটা ছাড়ও দিলেন।

কিন্তু শেষ হয়ে গেল সব কিছুর। সেদিন বৃহস্পতিবার। রাত ৮টার দিকে শেষ বিদায় ও। তখন ওর বাবা ছিল হসপিটালে একা। মা যে তাঁর তখনো জানতেন না। বাবা নিথর!

সবাইকে হাসিয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল ছেলেটির, ফিরলোও সেই – তবে সবাইকে অঝোর ধারায় কাঁদিয়েই।

বলাই বাহুল্য,  মাইক্রোসফট-এর ফ্রিল্যান্সিং প্রোগ্রামার এই ছেলেটি প্রোগ্রামিংও বেশ পটু ছিল। আর কথাতেও। কমেন্টের সবাইকে আশাবাদী করেছিল – ৩ মাস পর ফিরে আসার। সবার অপেক্ষায় ছিল- তার স্বরূপে প্রত্যাবর্তনের। কিন্তু ‘বিগ-ডাটা প্রোগ্রামার’ হওয়ার স্বপ্নটা তাঁর অধরাই যে রয়ে গেল।

২০১৭ এর জুনে ধরা পড়ল মরণ ব্যাধি ব্লাড ক্যান্সার। দেশে চিকিৎসা শেষে ভারতে চিকিৎসা শুরু ২০১৭ এর আগস্টে। সেই থেকে টানা ৯ মাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার জীবনটাও প্রোগ্রামিং-এর ইনিফিনিটি লুপে চলে গেল। এত এত কেমো থেরাপি, লাখ-লাখ টাকা খরচ, এত এত স্বান্ত্বনা-আশ্বাস-শুভকামনা-স্বপ্ন সব কিছু মিথ্যা প্রমাণ করে না ফেরার দেশে পাড়ি দিল ছেলেটি।

এত এত যুদ্ধ।

কিন্তু, পরাজিত।

এ পরাজয় সকলের বিশ্বাসের।

ব্যর্থ মিথ্যা আশ্বাস- মৌখিক সাহস জোগানো।

এরকম ভাবেই, হয়তো আমার পোস্টগুলো-ছবিগুলো-কমেন্টগুলো আমারই মত করে হয়তো কেউ দেখবে-লিখবে-বলবে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথেই সব দায়-দায়িত্ব, স্মৃতি-অনুভূতি, দেনা-পাওনা যে সেকেন্ডের কাটার কয়েকটি ঘূর্ণনের ব্যবধানেই শেষ।

কারণ, সবকিছুর শেষে,

মৃত্যুই যে সবচেয়ে বড় সত্য!

কে জানে- আপনার-আমার লেখা শেষ পোস্টগুলো নিয়েও হয়তো এমন করেই কেউ লিখবে, কেউ পড়বে, কেউ বা অন্য কেউ দেখার আগেই হাতের তালু দিয়ে বেয়াড়া চোখের জলকে মুছে নিবে পড়তে-পড়তে!

আসুন এবার সেই বেধনাবিধুর-হৃদয়স্পর্শী লেখাগুলোতে চোখ বুলিয়ে দেখি, সত্যি-সত্যি ওকে দেখা যায় কি-না, কান পেতে রই- সত্যি সত্যি ওর কথাগুলো শুনতে পাওয়া যায় কি-না।

লড়াকু সেই ছেলেটির লড়াকু, দীপ্ত-শাণিত সেই মনের কথাগুলোঃ 

নিজের রক্তের জন্য নিজেই পোস্ট দিয়েছিল সেই হতভাগ্য ভবিষ্যৎ প্রকৌশলী। যা থেকে সহজেই তার বেঁচে থাকার আকুতি প্রতীয়মান হয়।

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Close